শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১১

নব বারতা নিয়ে আসুক বৈশাখ

শরিফুল ইসলাম সেলিম
পয়লা বৈশাখ। বাঙ্গালী জাতির জীবনে এক অবিস্মরনীয় দিন। বৈশাখ মানে- শুরু, আগামী দিনের স্বপ্নের। হাজার হাজার বছর ধরে বাঙ্গালী জাতি বৈশাখকে শুভসূচনা হিসেবে বরণ করেছে। বছরের নতুন সূর্যের সামনে বাঙালি আজ প্রণতি রাখবে এই বলে যে, জীর্ণপুরাতন যাক ভেসে যাক, মুছে যাক গ্লানী/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূষর্ুরে দাও উড়ায়ে'। বৈশাখ আসে নতুন করে। নতুনের আলোয় আবহমান বাংলার দিক-দিগন্ত উদ্ভাসিত করে আসে নতুন দিন। নবপ্রভাতে বাঙালির জীবনে চারদিকে নতুনের কেতন উড়িয়ে এসেছে বৈশাখ। আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগি্নস্নানে শূচি করে তুলতে আসছে বৈশাখ। এরই সাথে বিদায় নিবে হাসি-কান্না আর আনন্দ বেদনার ১৪১৭ সন। নতুন করে যাত্রা শুরু করেবে বাঙ্গালী । এ যাত্রা আবার বিলিন হবে আগামী বৈশাখে। বাঙ্গালী পরম্পরায় এদিনটি কেবলই আনন্দের, নতুন করে শুরু করার। বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত বাংলার চারদিক। একই সাথে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল বাঙ্গালী আজ নতুনের আবাহনে কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের লেখা গীত সেই চিরায়ত সুর বাঙালির প্রাণে প্রাণে অনুরণন তুলবে। বাঙ্গালী এক সাথে গাইবে, 'এসো হে বৈশাখ এসো এসো'। আবার একইভাবে জাতীয় কবি নজরুলের কালজয়ী রচনা-, তোরা সব জয়ধ্বনি কর /তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখীর ঝড়'। এ সুরধ্বনির মধ্যে দিয়েই বাঙালি নতুন বছরে সব অপ্রাপ্তি ভুলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। মাঠে-ঘাটে কচি-কাঁচার কলরব আর পেঁতপুঁত বাঁশি আর ঝুনঝুনির এলোপাথারি হরেক রকমের সুরধ্বনি। বাংলার গ্রামীন জীবনে পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহুদিনের। এই সন প্রবর্তনের সূচনা থেকেই। চিরকাল ঋতুর উপর ভিত্তি করেই হয় ফসলের চাষাবাদ। মোগল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন বাংলা সনের। এর আগে মোগল বাদশাহগণ রাজকাজে ও নথিপত্রে ব্যবহার করতেন হিজরী সন। হিজরী হচ্ছে চন্দ্র বছর, যা নূ্যনধিক ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয় । কিন্তু সৌর বছর পূর্ণ হয় নূ্যনধিক ৩৬৫ দিনে। বছরে প্রায় ১১ দিনের পার্থক্য হওয়ায় হিজরী সন আবর্তিত হয় এবং ৩৩ বছরের মাথায় সৌর বছরের তুলনায় এক বছর বৃদ্ধি পায়। কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে সারাদেশে একটি অভিন্ন সৌর বছরের প্রয়োজন। এই ধারণা থেকেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহনের সময় অর্থাৎ ১৫৫৬ খৃস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। আকবরের নবরত্ন সভার আমির ফতেউল্লাহ খান সিরাজী বাংলা সন প্রবর্তন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলী সন। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বৈশাখ নামটি নেয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখার নাম থেকে। 'বিশাখা হতে নাম হল বৈশাখ। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরো বিস্মৃত হয়। রূপান্তরিত হয় লোকজ উৎসবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। এদেশে ১৯৬৫ সাল থেকে রমনার বটমূলে প্রতিবছর ছায়ানট বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালা নগরীতে নতুন তাৎপর্য পায়। একে একে আরো অনেক সংগঠন প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। আধুনিক জীবন-পদ্ধতির নানা উপাচারের সমারোহে খেরো খাতায় হিসাব রাখার প্রচলন এখন উঠেই গেছে। তবু বাঙালির চিরায়ত উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয় হালখাতা, মিষ্টিমুখ করান হয় ক্রেতাদের।

জাতীয় ভাবে আইন দিবস পালন করা হোক

শরিফুল ইসলাম সেলিম

কথায় বলে সকলের জন্য আইন। আইনের চোখে ধনী-দরিদ্রের কোনও পার্থক্য নেই। অথচ বাস্তব চিত্রটা একেবারেই আলাদা। অনেক ক্ষেত্রেই যাদের অর্থের জোর নেই, সুবিচার তাদের কাছে অধরা থেকে যায়। মামলা-মোকদ্দমা করতে টাকার প্রয়োজন। এই অনুধাবন থেকেই দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে বিনা খরচে আইনি সহায়তা পৌঁছে দিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত পর্যন্ত সর্বত্র গড়ে তোলা হয়েছে আইনি সচেতনতা কেন্দ্র। যেখানে সম্পূর্ণ বিনা খরচে আইনি সাহায়তা পেতে পারেন দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া মানুষ, শিশু, মহিলা, প্রতিবন্ধীরা। কিন্তু প্রচারের অভাবে আইন পাশের ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের বেশিরভাগ মানুষই এই সেবা থেকে বঞ্চিত অথবা অজ্ঞাত ।
সাধারণ মানুষকে আইন সর্ম্পকে সচেতন করে তুলতে দরিদ্র,পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থে ২০০০ সালে লিগাল এইড সার্ভিসেস এ্যাক্ট ২০০০” পাস করা হয়। কিন্তু আজও অনেকেই এই সেবা সর্ম্পকেই জানেনই না। অনেকে জানলেও দ্বিধা থেকে আসেন না। আবার আইনের আশ্রয় নিতে গেলে অনেক সময় পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের হাতে হেনস্থা হতে হয়, আদালতে বিচারক থেকে কর্মচারী সঙ্কটের কারনে মামলা নিস্পত্তিতে র্দীর্ঘসূত্রিতা- সবমিলিয়ে আদালত সর্ম্পকে মানুষের এক ধরনের অনাস্থার প্রসঙ্গও উঠে আসে প্রয়ই । আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও অনেক সময় পুলিশ বা রাজনৈতিক দলদ্বারা হয়রানি হওয়ার অভিযোগও ওঠে। আবার অনেকে ভাবেন আদালত মানেই তো সেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার খরচ। এই ভ্রান্ত ধারনা থেকেই অনেকে আদালতমুখী হন না। আবার মামলা নিস্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার কারনে হতাশা থেকে অনেকে আদালতে যেতে চান না। বাংলাদশের অধিকাংশ মানুষের মনে এ ধারনা বদ্ধমূল।তাই আইনের সেবা যাতে অতি সহজেই সবাই পেতে পারে সেজন্য ব্যাপক প্রচারনা চালানোর জন্য একটি দিনকে জাতীয় আইন দিবস হিসেবে ঘোষনা করে পালন করা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশেই জনগনকে আইন সম্পর্কে সচেতন করার জন্য জাতীয় ভাবে ব্যাপক উদ্দীপনার সাথে আইন দিবস উদজাপন করা হয়।তাই আমাদের দেশেও আইন দিবসের ঘোষনা এখন সময়ের দাবি।
(ছাত্র,৪র্থ বর্ষ,আইন ও বিচার বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

মানহানি আইনের সংশোধন কতটা ইতিবাচক

শরিফুল ইসলাম সেলিম
গত ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) বিল পাস হয়েছে। এ সংশোধনীতে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের অভিযোগে করা মামলায় কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে।যা দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের দেশের সাংবাদিকরা দাবি করে আসছিলেন।এই সংশোধনীর পর সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন “মানহানিকর সংবাদ এমন কোনো অপরাধ নয়, যাতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে হবে। তাই এ সিদ্ধান্তটি যথাযথ হয়েছে। আইনটি নেতিবাচকভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। সাংবাদিকেরা আদালতের কাছে দায়বদ্ধ। এ কারণে তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারবেন না।

আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী ঘটনা। তথ্য অধিকার আইন পাস হওয়ার মাধ্যমে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটবে সংবাদমাধ্যমে এটাই স্বাভাবিক । তাই সংবাদমাধ্যমকে নির্ভয়ে সব তথ্য বা সংবাদ জনস্বার্থে অবহিত করার সুযোগ দেয়া উচিত। এ অবস্থায় ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন অত্যন্ত ইতিবাচক।এবং এর ফলে সাংবাদিকদের মানসিকভাবে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তাঁরা অহেতুক হয়রানির শিকার না হন। তবে মানহানি-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করায় ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই প্রভাবই আছে। ফৌজদারি আইনে জামিনযোগ্য মামলায় সাধারণত ওয়ারেন্ট জারি হয় না। সমন জারি হয়। কিন্তু মানহানি-সংক্রান্ত ধারায় জামিনযোগ্য মামলা হলেও ওয়ারেন্ট জারির ক্ষমতা ছিল। এটি ব্রিটিশ আমলে প্রণীত আইন। এখন এটি করা হয় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ পরিবেশন যেন না করে এ পথ বন্ধ করার জন্য। কিন্তু বর্তমানে মানহানি-সংক্রান্ত মামলায় সমন জারি করাই যথেষ্ট। কারও বিরুদ্ধে সমন জারি হলে আদালতে এসে জামিন চাইতে পারে। কিন্তু সরাসরি ওয়ারেন্ট জারি করে হেনস্তা করার প্রয়োজন নেই। এর ফলে সাংবাদিক, লেখকের ওপর রাজনৈতিক হয়রানি করার সুযোগ কমে যাবে। সাংবাদিকেরাও নির্বিঘ্নে সত্য খবর প্রকাশ করতে পারবেন।
তবে এর নেতিবাচক দিক হচ্ছে, একশ্রেণীর হলুদ সাংবাদিককে উসকে দেওয়া হতে পারে। অনেক পত্র-পত্রিকায়ই মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করতে দেখা যায়। এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত থাকে। এখন ওয়ারেন্ট ইস্যুর ক্ষমতা বাতিল হলে এগুলো উৎসাহিত হতে পারে। সাংবাদিকদের নামে যাচ্ছে তাই খবর পরিবেশন করার সুযোগ বেড়ে যাবে এবং তাঁদের জেল-জরিমানার ভয় কমে যাবে। সাংবাদিকতা একটি সম্মানের পেশা। এ পেশায় সম্মান রক্ষা করা তাঁদের দায়িত্ব। সবার উচিত, এ আইনকে সাধুবাদ জানিয়ে আরও দায়িত্ববান হওয়া।

লেখক,ছাত্র,৪র্থ বর্ষ, আইন ও বিচার বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।