বুধবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১১

ভ্রান্ত পথে চলা

ভ্রান্ত পথে চলা
উৎসর্গ: যারা ভ্রান্ত পথ পরিহার করতে চায়।

দশ মাইল ফাঁক থেইক্যা আইলাম। একুটু বইস্যা জিরাইয়া লই।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------এই রিক্সওয়ালা জোরে যাও; এমননিতেইত দেরী করে ফেলেছ।
: কেমনে যামু সাব? দেখতাছেন না বাতাস কেমুন, বৃষ্টি হইবে।
: আহ্! বৃষ্টিত চলে এসেছে। তোমার রিক্সায় পলিথিন রাখনা কেন? ছাতা আছে নাকি দাও। আমি বৃষ্টিতে ভিজতে পারি না।
: রিক্সওয়ালা ছাতা বের করে দিল। ধীরে ধীরে চলছে রিক্সা। অফিসের সামনে এলে বৃষ্টি থামল সিক্ত রিক্সা চালক সাহেবকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে চলল গন্তব্যে।
(১০+৯) টি ধাপ পেরিয়ে দোতলায় অফিস।
: সোলায়মান সাহেব দেরী হল যে আজ?
: রাস্তায় যত চোরের আমদানি। নেতা চোর, কর্মি চোর, ভোক্ত চোর, আমি-আপনি সব।
: বড় সাহেব সালাম দিয়েছেন, যান সোলায়মান সাহেব।
বড় সাহেবের ধমক খেয়ে সোলায়মান ফিরে এল। আজ নাকি সোলায়মানের জন্য অফিসের বেশ কিছু টাকা লস গেছে। বড় সাহেব গাড়ী করে অফিসে আসেন, উনি কি বুঝবেন কষ্টের? সোলায়মান আসে রিক্সা করে; রাস্তা যে খারাপ রিক্সাওয়ালাদের কষ্ট। ৭১ এর পর স্বাধীন দেশে স্বাধীন প্রতারকের দল আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে মানুষকে আর তারা মানুষই ভাবেনা।
: কি সোলায়মান কি ভাবছেন?
: না আজ আর ভালমনে কাজ করতে পারব না দাদা।
অফিস থেকে সোলায়মানের বাড়ী খুব বেশি দূরে না; দুই/তিন কিলোমিটার হবে আর কি। ছোট চাকরি করে সোলায়মান; টেম্পুতে যাবার সমর্থ নেই রিক্সায় যায়। এক কেজি আপেল কিনল সলেমান তার পর রিক্সায় উঠে রওনা দিল। ছোটবেলা বাবা-মা ওকে সলেমান বলেই ডাকত অবশ্য।
: স্যার ছাতাখান যে নতুন।
: হ্যাঁ আজই কিনলাম। যে রোদ পড়েছে।
পড়ন্ত বিকেলে রিক্সা দ্রুত যাচ্ছে। রিক্সাওয়ালার গা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছিল। রোদ বেশি নেই তবুও ছাতা মাথায় নিয়ে বসা সোলায়মান। রোদটা সোলায়মানের কাছে প্রচণ্ড হলেও রিক্সাচালকদের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক।
সদ্যবিবাহিত সোলায়মান, বউগেছে বাপের বাড়ী। আজ বাড়ী ফেরার কথা। এবার বৌকে কথা দিয়েছে বাপের বাড়ী থেকে ফিরলে তার মামা বাড়ী দেখাতে লিয়ে যাবে। অফিস থেকে ছুটি নেবার কথা ভাবছিল সোলায়মান; আর নেবেইত ছুটি না নিয়েত আর দুচারদিন বেড়ানো যাবে না; যে বড় সাহেব!
: কবে ফিরলেন সোলায়মান সাহেব?
: গত রাতে।
: কেমন দেখলেন মামা শশ্বুর বাড়ী?
: ভাল, নতুন জায়গা হানিমুন আর কি;
: হবেইত কক্সবাজার বলেকথা।
ফিরে শুনল সোলায়মান বড় সাহের বদলি হয়েছেন, নতুন সাহেব আসেননি। কাজ-কর্ম কিছু তেমন নয়। জানেনত সরকারি কাজ বলে কথা। কে কখন আফিসে আসে যায়, কে নিয়ন্ত্রণ করে?
একবার সোলায়মান বড়সাহেবের অধীনতামূলক মিত্রতা মেনে না নেওয়ার একমাস বরখাস্ত হয়েছিল। সোলায়মান বাড়ীর খায় ছোট চাকরি করে কিন্তু বাপের অবস্থা ভাল। তাই একমাস বেতন না পেলে যে না খেয়ে মরতে হবে তা নয়। কাজটি অবৈধ, তাই সোলায়মান অস্বীকার করেছিল।
: অই রিক্স যাইবা নাকি?
: বেটায় ঘুমাইচে; চল।
: সলেমান মিয়া দিনে দুপুরে ঘুমাও কেন? প্যাসেঞ্জার আইস্যা চইল্যা যাইতাছে, ওঠ মিয়া।
: আ-হ-আ-আ-আ-আ, শরীলডা কেলান্ত লাগতাছে।
: নাকি নয়া বিবির সপন?
: এই যে রিক্সা যাবে নাকি?
: যামুনা কেন? যাওনের লাইগ্যাইত রিক্সা লইয়া বাইর হইচি, ওঠেন।
নিদ্রাভঙ্গের পর রিক্সাওয়ালা (সোলায়মান) সলেমান মিয়া আবার রিক্সা চালাতে আরম্ভ করল এবং বাস্তব জীবনে ফিরে এল।

আবার হবে শুরু..........


রচনা: ফাত্তাহ্ তানভীর মো: ফয়সাল (রানা চৌধুরী)
তারিখ: ২২/০৭/২০০১

বৈতালী

“আমরা সেই অধ্যায় থেকে অনেক দুরে রইলুম। “(কবি কুড়িল মুখোপাধ্যায়)
বৈতালী
রচনা: ফাত্তাহ্ তানভীর মোঃ ফয়সাল

অদ্ভুুত কোন এক কিছু
দূর্লভ-দুর্জয়;
অশালীন এক মানস পট
চিত্র পটে এক নটী
দৃশ্য কল্পে ফলপ্রসূ আবাহন
আহ্বান অসীমের ।
থথথথথথথথথথথথথকবি কুড়িল মুখোপাধ্যায়

এই পথটি কিছুদিন আগেও ছিলনা। এখানে নতুন পথের সৃষ্টি হয়েছে। স্টেশন থেকে এই পথে গেলে গাঁয়ের পথটি অনেক কমে যায়। পথের পাশে আম গাছের ছায়ায় চলছে চুলা তৈরীর প্রস্তুতি। মনে হয় সেখানে একটি ভাজা-পোড়ার দোকান চালু হবে। নবপথ-নবমত-নব চেষ্টা-নবদিগন্ত-নব সভ্যতা। এই পথকে ঘিরেই সৃষ্টি হবে মানুষের চলাচল; তৈরী হবে বিভিন্ন দোকান, মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। অনেক দিন পর এই পথটি পরিণত হবে জনশ্র“তিতে। নতুন সভ্যতার সৃষ্টি, সভ্যতা থেকে সভ্যতার পরিবর্তন বুঝি এভাবেই হয়। এই পথ পথগুলোকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়েছে জীবন-জীবিকার নতুন পদ্ধতি। পথগুলোকে আশ্রয় করে মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদ অনুভব করে।
কুয়াশা হাল্কা হতে চলেছে। ভোরের প্রভা দেশ জুড়ে। যদিও শীতের মেয়াদ ফুরিয়েছে, তবুও আজ হঠাৎ কুয়াশার দেখা। আলাপী শাড়ী গুছিয়ে নিল, চুলের খোঁপা ঠিক করে নিল; এরপর নিজেকে পর্যবেক্ষণ করল খুব ভালভাবে। বাড়ীর দিকে হাঁটা দিল আলাপী। মুখে বড় ঘোমটা, কোলে ছোট্ট পুঁটলি। বাড়ীগিয়ে স্নান সেড়ে স্বামী সন্তানদের আহার তৈরী করবে আলাপী। এই আমাদের ঘূর্ণায়মান সমাজ ব্যবস্থা।
সকালের ট্রেন চলে গেছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে মানুষ, বাড়তে থাকে, মানুষের কর্মচঞ্চলতা। সবাই কাজে বের হয়ে যায়, আলাপীর স্বামী যায় আলাপীর সন্তানরাও।
আলাপীর দুই কন্যা-দুই পুত্র। বড় ছেলে নয়/দশ বছর হবে; সে হোটেলের কাঁটা পরিষ্কারক। মেয়ে ছয়/সাত বছর হবে; বাড়ীতেই থাকে, এরপর ছেলেটি চার বছর বয়স হবে। সর্বশেষেরটি এক বছর বয়স। আলাপীর সন্তানেরা স্কুলে যায় না। স্বামীর রোজগার নিতান্তই কম; বাধ্য হয়েই রোজগারে নামতে হয় আলাপীকে।
আলাপীর সংসার ভালই চলছিল; ভ্যান চালক স্বামীর পরিশ্রম দুই বাচ্চা; একজন স্কুলে যেত। সংসারের সচ্ছলতার জন্য আলাপী মাঝে মাঝে দিন হাজিরার কাজ করত; যেমন: মাটি কাটার কাজ ধান সেদ্ধ ইত্যাদি। সংসার ভালই চলতেছিল। সেই সংসার সবচেয়ে সুন্দর যে সংসারে শান্তি আছে; আছে সুখের আলোক ছটা। আলাপীদের বসত ভিটাটুকুই সম্বল; বাড়ীটুকু এবং আশে পাশে দু-একটি ফলবৃক্ষ; চাষাবাদের উপযুক্ত কোন জমি নেই। মাটির দেয়ালের ঘর আলাপীর। মাটির মানুষ-মাটির মন-মাটির দেয়াল-মাটির কাজ; চেতনার কেন্দ্রে মাটি। মাটির দেয়ালের ঘরে যে এত সুখ থাকতে পারে আলাপীকে না দেখলে বুঝতাম না। আলাপীর সন্তানরা এখন আর স্কুলে যায় না।
আলাপীর নতুন বিয়ে হবার পর; স্বামী রজব যাচ্ছিল শ্বশুরবাড়ী। আলাপী জিদ করল ডিঙি নৌকোয় যাবে তারা; যাবে এবং দুজনে শুধু। শ্বশুরবাড়ী তাও আবার বিয়ের পর নতুন। পড়ন্ত বিকেলে দুজন ডিঙিতে। মাঝির বৈঠার শব্দ অদ্ভুত ছলাৎ-ছলাৎ-ছলাৎ। সাথে অনিন্দ্য বাতাস। বাতাস যেন নদীর জলের কাছে এসে; উভয়ের শুভ্রতা মানুষের মাঝে ঢেলে দেয়; মানুষকে তারা আহ্বান জানায়-এসো আমরা একত্রে শুভ্র-শীতল হই। ডিঙি; শুভ্রতার চিহ্ন সভ্যতার হত্যাযজ্ঞের কোন নিদর্শন এতে নেই; এতে কোন কলকঞ্জার ছোঁয়াও নেই। যারা ডিঙি চালক তারাও সহজ প্রাণ মানুষ। ডিঙিনৌকার ভাড়া আলাপীকেই গুনতে হয়েছিল। আলাপী াতর মা থেকে টাকাগুলো পেয়েছিল।
অনেকদিন আগের কথা; রাতে স্টেশনে আলাপী তার মায়ের সাথে থাকত, তখন তার বয়স বার/তের হবে। তখন আলাপী ও তার মা ছিল জলে ভাসা পদ্ম। আলাপী বুঝত না এত কথা; শুধুৃ দেখত তার মা এ বাড়ী ও বাড়ী ঘুরে বেড়াত কাজের জন্য; সাহায্য চাইত খাবার জন্য। অনেক ধরনের লোককে দেখত আলাপী তার মায়ের সঙ্গে; তারা তার মাকে নানান সাহায্য করতে আসত।
সেদিন রাতে আলাপীর ঘুম ভেঙ্গেছির তীব্র কষ্টে। একজন বয়স্ক পুরুষ তার গায়ের উপর শুয়ে আছে। গায়ে তার বিশ্রীগন্ধ; কিসের গন্ধ আলাপী বুঝতে পারোনি। হোৎকা মতন লোকটি আলাপীকে উন্মত্ত হয়ে চুমু খাচ্ছে; জড়িয়ে ধরে আছে প্রচন্ড শক্তিতে; আলাপীর নড়ার শক্তি নেই। আলাপী তার যৌনাঙ্গে ব্যাথা অনুভব করছিল। আলাপী ঠিক বুঝলনা কি হল; তবে বুঝল তার দেহে কিছু একটা পরিবর্তন ঘটল। যে ব্যক্তি এই ঘটনা ঘটলে তাকে আলাপী চিনতে পারল; তার মায়ের সঙ্গে দেখেছে তাকে। ঘটনা ঘটার বেশ কিছুক্ষণ পর আলাপীর মা ঝুপরিতে প্রবেশ করল। লজ্জায় ও ঘৃনায় আলাপী; (বিশেষত: ভয়ে) তার মাকে কিছু বলতে পারেনি। পরদিন সকাল আর দশদিনের মতই খুব স্বাভাবিক; কর্মচঞ্চল মানুষ; কর্মচঞ্চল পৃথিবী; কারও কিছু হয়নি গত রাতে। সেই প্রথম আলাপী যৌন নিপীড়নের শিকার হল।
আলাপী তার সন্তানদের বড় বেশি ভালবাসে। নিরুপায় হয়েই তার বড় ছেলেকে হোটেলে কাজে লাগিয়েছে। বাকি দুই দেলে মেয়ে এখনও তেমন কাজের উপুযুক্ত হয়নি। আলাপী-তার স্বামী-বড় ছেলে যা আয় করে তা দিয়ে কোন মতে সংসার চলে ওদের। যতক্ষন বাড়ী থাকে ওদের বুকে-পিঠে করে রাখে আলাপী; এতটুকুও অনাদর হতে দেয় না ওদের। সমবয়সী সব ছেলে মেয়ে ইস্কুলে যায়; আলাপীও ভাবে মাঝে মাঝে। সাধ হয় আলাপীর কিন্তু সাধ্য হয় না। যে বাড়ীতে আলাপীরা থাকে; সেটিও ছেড়ে দিতে হবে কিছুদিনের ভেতরে। চিন্তায় আলাপী প্রায়ই বিমর্ষ হয়ে পড়ে। বিমর্ষ হয়ে কোন লাভ নেই, ঘর তাদের ছাড়তেই হবে।
এই রকমভাবে ঘর ছাড়তে হবে কখনও ভাবেনি আলাপীরা। বসত করছে প্রায় ত্রিশ বছর। এরই ভেতর তারা এই বাড়ীটি নিজেরই ধরে নিয়েছে। বাড়ীতে রজব ও রজবের মাকে থাকতে দেয় রজবের মায়ের মনিব। কথা ছিল লিখে দেবার; ভুল করে লিখে দেননি। আলাপীর শ্বাশুড়ীর মনিব মারা গেছে বেশ কিছু দিন। তার ছেলেরা এই জায়গা বিক্রি করেছে অন্য মানুষের কাছে। প্রকৃত মালিক বেঁচে থাকলে হয়ত ওদের এভাবে ভিটেমাটি ছাড়া করতেন না। যা হোক, জমির ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই উচু তলার মানুষ। তাদের সঙ্গে ঠিক পেরে উঠবেনা আলাপীরা। জমি তাদের ছাড়তেই হবে।
বছর তিনেক/চারেক আগেও আলাপীর সংসার ভালই চলত। ভ্যান চালক স্বামীর রোজগার ছিল; নিজেও মাঝে মধ্যে দিন হাজিরা কাজ করত। দুটি সন্তান ছিল; এক সন্তান ইস্কুলে যেত। মোট কথা সংসারে সুখের আভা দেখা দিত। এর মধ্যে আলাপী সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়ল; এটা তাদের তিন নম্বর সন্তান হতে চলেছে..................................তৃতীয় বারে আলাপী পুত্র সন্তান প্রসব করল। রজব মিয়ার খুশি ধরে না দুটি পুত্র সন্তান রজবের। এক পোলারে রজব মিয়া ইস্কুলের মাস্টার বানাইবো; আর এক পোলারে বানাইবে ম্যাম্বার। সাত দিন চলে গেল; বাড়ীতে সন্তান প্রসাবের আমেজ শেষ; সবাই বাড়ীর কাজে নিয়মিত হল। আলাপী তার কাজে ব্যস্ত হল; বড় ছেলে স্কুলে যেত। রজব ভ্যান নিয়ে বের হত প্রতিদিন। রজব রোজকার মত সেদিনেও ভ্যান নিয়ে বের হয়েছিল। কিন্তু, সেদিন প্রতিদিনের মত ছিল না। আলাপীদের একটি মাত্র কাঁচের প্লেট ছিল; হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে গেল। বড় রাস্তায় বাসের সাতে দুর্ঘটনায় রজব আহত। পনের দিন রজব হাসপাতালে থাকল এর পর; তাকে বাড়ী আনা হল। বাড়ী আনার পর চলল কবিরাজী চিকিৎসা। হাসপাতালের ডাক্তাররা রজবের একপা কেটে ফেলেছে। পায়ের উপরে বাসের চাকা গেছে, তাই পা না কেটে উপায় ছিল না। রজব যে প্রাণে বেঁচে আছে এই আলাপীর শান্তি।
এই পনের দিনের বর্ণনা দেওয়া খুব দুঃসাধ্য। পৃথিবীতে আলাপী ছাড়া অন্যকেউ এই পনের দিনকে অনুভব করতে পারবে না। পনের দিনে বেশ টাকা ব্যয় হল রজবের জন্য্ কিছু টাকা সাহায্য, কিছু টাকা এসেছে ঋণ থেকে, কিছু টাকা জমানো ছিল; সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছিল রজবের ভ্যান বিক্রি। এখনও কবিরাজ চিকিৎসা চলছে। সামনে অনেকদিন বাকী............অনেকটা পথ পেরুতে হবে; কিন্তু, হাত একদম খালি। আলাপীর মাথা ঘুরতে থাকে; কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা। একদিকে স্বামীর যতœ, চিকিৎসা অন্য দিকে সন্তানদের যন্ত্রণা....................।
এখন আলাপীকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিভাবে অর্থ আসবে সংসারে, কিভাবে অর্থ বন্টন করবে এবং সর্বোপরি কিভাবে তাকে সংসার পরিচালনা করতে হবে। আলাপী ছাড়া এই সংসারে আর কেউ নেই। আলাপী এখই এ সংসারের কাণ্ডারী। একজন মানুষ একজনের দ্বায়িত্ব নেবে। একজন মেয়ে মানুষ এত মানুষের দ্বায়িত্ব নেবে কেন? এটা অনুচিত। আলাপীর এখন পালিয়ে যাওয়া উচিৎ; তার নিজের পথ নিজের খোঁজা উচিৎ। এই সমাজের কোনও মানুষ কারও জন্য কিছু করে?
আলাপী সিন্ধুর মাঝে বিন্দু খুঁজে পায়। অন্ধকার আমাবস্যার রাতে দেখতে পায় একটি তারার। আলাপী সংসার-সন্তান-স্বামী ছেড়ে যেতে পারেনি; পারেনা। কোন বাঙালি মেয়ে এ অবস্থায় স্বামী-সন্তান-সংসার ছিন্ন করে যেতে পারবে না। যদি কেউ পারে তবে সে ডাইনীথথথথথথথথথথমাতা-বধূ-স্ত্রী নয়।
আলাপীর পোলার ইস্কুলে যাওয়ন বন্ধ অয়। অয় যাইতে শুরু করে হের মনিবের বাড়ী। আলাপীর চোখের সামনে সব রং কেবল হলুদ মনে হয়। আলাপীর মাথা ঘুরতেয়াছে, কখন যে পইড়া খাইবে বলা কঠিন। কিন্তু, আলাপী মাথা ঘুরে পড়ে না। আলাপী দৃঢ় চরিত্রের বাহক। এত সহজে ভাইঙা পড়লে ওগো চলবো কেমনে, হেরা ত গরীব মানুষ; হেরা একবার ভাঙবো আবার জোড়া লাগবো।
আলাপী আমিত বর্ণের মেয়ে নয়। আলাপী ফলো বর্ণের মেয়ে; ফর্সাও কালোর মিশ্রণ হল ফলোবর্ণ। তবে বড় ঘরে জন্ম হলে আলাপীকে সবাই সুশ্রী বলত। যতেœর অভাবে আলাপীর রং তামাটে হবার পথে। তবুও আলাপী সুন্দর। ফলো বর্ণের ভেতরে আলাপীর গায়ের রং ফর্সার দিকটাই বেশি। গরীবের বউ আলাপী, অভাবীর বৌ আলাপী ভ্যান চালকের বৌ আলাপী, ভিক্ষুকের বউ আলাপী। আলাপীর রূপ নিয়ে রজব গর্ব করে। ভ্যান চালকের বৌদের ভেতরে আলাপীর রূপ একটু ভিন্ন। আলাপী বড় আলুথালু, এলোমেলো মেয়ে।
দোহারা গড়ন আলাপীর; ফলো বর্ণের মেয়ে সে। বিবাহিত মেয়েদের শরীর যেমন হয তেমনি শরীর আলাপীর। আলাপী খালিপায়ে থাকে; লাল রঙের শাড়ী পড়ে। মাথায় মাঝেমাঝে ঘোমটা থাকে; শাড়ী মনের অজান্তে কখনও বুকের এক পাশ থেকে সরে যায়; আলাপী খেয়ালই করেনা। যুবক বয়সী দু/একজন ছেলে তখন মুগ্ধ হয়ে আলাপীকে দ্যাখে; হয়ত এ অব্যক্ত-নীরব ভালবাসা। হাতে বালা থাকে না আলাপীর; পেটিকোট-ব্লাউজ নিতান্তই নোংরা মনে হয়। শরীরে হয়ত ঘামের গন্ধ; এ গন্ধ জমতে জমতে এক ভিন্ন গন্ধে পরিণত হয়েছে। এগন্ধে রয়েছে অসীম ভালবাসা; এক মোহিনী যাদু। সারা দিন পর ক্লান্ত শরীরে স্বামী এ গন্ধকে মনে করে স্বর্গীয় সুবাতাস। এ গন্ধ স্বামীর চাইই; এ গন্ধ ছাড়া স্বামীর প্রাণ বিসর্জিত হবে। স্ত্রীও বিষয়টি অনুভব করে; উপভোগ করে দারুণ ভাবে।
ইদানিং আলাপী পরিপাটী হবার চেষ্টা করে। সস্তা দোকানের কিছু স্নো, পাউডার, লিপস্টিক, চুলের বেণী দিয়ে নিজের মত প্রসাধনে ব্যস্ত থাকে। সাধারণত শিক্ষিত মানুষের এ ধরনের প্রসাধনের গন্ধ বিশ্রী বা বোঁটকা মনে হতে পারে। কিন্তু, গ্রামের মেয়ে যখন ঐ প্রসাধনীগুলো ব্যবহার করে তখন তার ভেতরে এক মোহ সৃষ্টিকারী দানবের উদ্রেক ঘটে। এই দানব যে কোন পুরুষকে আবিষ্ট করতে পারে; ধরে রাখতে পারে ঘন্টার পর ঘন্টা; বছরে পর বছর। এটাই আমাদের সমাজের চলমান রীতি এটাই হয়ে থাকে; এটাই হতে হয়; এটাই হয়ে যায়। গ্রাম্য মানুষের আকাঙ্খা এর চাইতে বেশি অজানা।
স্বামী যখন অসুস্থ ছিল সংসারের হাল আলাপীই ধরেছিল, সে কাজ নিয়েছিল সরকার বাড়ীতে। তার ছেলেকে পাঠিয়েছিল গরুর রাখাল হিসাবে। সকালে বাসন মাজা, ঘরে-বাহিরে ঝাড়– দেওয়া, গরুর চাড়িতে পানি, এছাড়া সাংসারিক যাবতীয় কাজ আলাপীসহ কয়েকজন মহিলা করত। এদিয়ে স্বামীর চিকিৎসা না হলেও আলাপীদের সংসার চলত; আর যাই হোক দিন ত চলে যায়। এভাবে ধীরে ধীরে রজবের কবিরাজ চিকিৎসা বন্ধ হল। রজব স্থবির, রজবের চিকিৎসা স্থবির, রজবের রোগ স্থবির; রজবের দিন ও স্থবির। রজব বসে বসে ভাবে তার বৌ একা সংসারের উপার্জন করে তারও কিছু করা উচিৎ। রজবের বৌ ভাবে বেশি বেতনের কোন কাজ চাই তার। যাতে সংসার চালানোর পাশা পাশি স্বামীর কবিরাজ চিকিৎসা ও চলে ভালমত। দিন ভালই চলছিল ওদের মাঝে মধ্যে দু-একটি বিপত্তি ছাড়া।
সরকার সাহেব হুজুর মানুষ। কিন্তু, তিনি তার ছেলেদের নিজ আদর্শে বড় করতে পারেননি। সরকার সাহেবের বড় ছেলে আলাপীর দিকে তাকাত আপলক নয়নে। আলাপী দেখেও না দেখার ভান করত; আত দেখলে-অত কথা কানে নিলে সমাজে চলা যায় না। সরকার সাহেবের ছেলেরা আলাপীকে বিভিন্ন সময়ে প্রেম নিবেদন করত; আলাপী কানে নিত না। সরকারের তিনপুত্র এক যোগে প্রেমে পড়েছে ওর। আলাপী একটু সুশ্রী আর সদালাপী, এটাই তার অপর‌্যধ। আলাপী কি এমন অপ্সরা ভাবে আলাপী।
এটা হল চতুর্ভুজ প্রেমের কাহিনী !
বাড়ীতে মেয়ে মানুষ কাজ করলে তার শরীর এমনি খাওয়া যায়। এ ধরনের চিন্তা চেতনা থেকেই সবাই এভাবে ভাবে। কিন্তু, সব মেয়ে মানুষ কি এক ধাঁচের হয়?
তারপরও আশায় বুক বাঁধতে দোষ কি? মনিবরা একই আশায় বুক বাঁধে !
সরকার সাহেবের বড় ছেলে একদিন আলাপীকে জড়িয়ে ধরেছিল। আলাপী চিৎকার করতে পারেনি; চিৎকার করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ, কাজটি হারানো মানে আলাপীর জন্য; আলাপীদের জন্য অশনি সংকেত। আলাপী শুধু দৃঢ় কন্ঠে অথচ ছোট ছোট করে বলেছিল, ”ছাড়েন সবাই দেইখ্যা ফেলবো তো। আমনে মোর বাই লাগেন মোরে ছাইড়া দ্যান।” ভাগ্য বিধাতা আলাপীর কন্ঠের ডাক শুনেছিলেন বোধ হয়। সরকার সাহেবের স্ত্রী হঠাৎ সে সময় এসে হাজির। প্রথম বার আলাপীকে ক্ষমা করা হয়। কিন্তু কিছু দিন যেতেই আবারও ঘটে এ ধরনের বিপত্তি। এর পর আলাপীকে বলা হয় সে ঐ ছেলে গুলির মাথা খেয়েছে। আলাপীকে কর্মচ্যুৎ করা হয়েছিল সরকার বাড়ী থেকে।
সে দিন আলাপীর কি যে হয়েছিল? অনেকদিন আগের পুরোনো জামা, পাজামা পড়ল। বড় ওড়না দিয়ে ঢাকল বুক। দৃষ্টি আলাপীর অসীমের দিকে, নিজেকে বড়দুরবগম্য মনে হতে থাকে তার। সামনের দিকে হাটা দিতে থাকে আলাপী..............। সেদিন আলাপীর হোটেলে কাজের প্রথম দিন। বাজারের সহজ মানের হোটেল; যে হোটেলে শুধু সকাল-দুপুর-রাতের খাবার পাওয়া যায় সেই হোটেলের বাসন মাজা, মাছ কাটা, ভাত রান্না ইত্যাদি। কর্মঘন্টা ভোর থেকে রাত নয়টা/দশটা পর্যন্ত। হোটেলে কাজ; কাজ করতে হয় বেশি সময় তাই বেতন ও বেশি।
হোটলের মালিক লোকটা টাকার আণ্ডিল। দুই বউ তার তার পরও আলাপীর দিকে চেয়ে থাকত ফ্যালফ্যাল করে। এই লোকটার কি যে দুরাশয় আলাপী বুঝতনা প্রথমে। এই লোকটি, আবার কখনও তার কর্মচারী আলাপীকে বাড়ী পৌঁছে দিত। এই দোকানের কর্মচারী এবং আশেপাশের অনেকেই আলাপীকে বাজাত বিভিন্ন ভাবে। আলাপী সব চোখ-মুখ বুজে সহ্য করত; শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য। অনেকে আবার বিয়ের প্রলোভনও দেখাত আলাপীকে; সে কোন কিছুতেই সাড়া দেয় না। এরপর দেখা যাক, শেষ আলাপী কতদূর পৌঁছাতে পারে?
আলাপীর স্বামী অসুস্থ হবারপর আলাপী কুয়োর ব্যঙ যেন সমুদ্দুরে পড়ে। তার কাছে মনে হয় সে ভুলে যাচ্ছে দেশাচার; পৃথিবী তার কাছে পরিণত হচ্ছে দুরভিগ্রহে। সংসার চলত তার টিন টিন করে; চৌপাশকে তার মনে হয় ছোপ ছোপ রক্তের আল্পনা। নিজেকে মাঝে মাঝে তার মনে হত ছায়ামূর্তি আবার কখনও মনে হত পুরনারী ! সে সবার কিন্তু কেউ তার নয়।
তুই আমার বাড়ীতে আয়; না আসব না। মোর লগে এট্টুগল্প কর; না করুম না। মোর বাড়ীতে জল-খাওন খা; না খামু না। দুগা কতা কমু; না মুই কমুনা। মোর দিকে চাইয়া র; না রমু না। মোর গাছের ফল পাকছে; ফল খাবি? না খাইমু না। মোর কাছ থেইকা ট্যাকা নিবা? না নিমু না তয তুই কিতা চাইস? আমি তরে চুমা খাইবার চাই ! খালি একডা বেশি না কইলাম।
আলাপী রাতে বাড়ী ফিরত, হোটেল মালিক তাকে বাড়ী পোঁছে দিত। রাতে ফেরার সময় আলাপী হোটেলে বাড়তি কিছু খাবার নিয়ে আসত, তার স্বামী ও অভুক্ত সন্তানের আহার ওতে সম্পন্ন হত। সেদিন হোটেলে খাবার অবশিষ্ট ছিল না আলাপীও কিছু নিতে পারেনি। চারদিকে সুনসান নীরবতা। দুজনার কেউই নিরবতা ভাঙেনা। আলাপীর মন ছনমন করছিল। আলাপী হঠাৎ শরীরে স্পর্শ পায়; তার সনে হতে থাকে অন্ধকার অমানিশায় কোন এক আশরীরী তার অঙ্গে হাত বুলাচ্ছে। আলাপী আবেশী হয়ে পুলক অনুভব করে। আলাপী এত পুলক ধরে রাখতে পারেনা হঠাৎ সে প্রেন্সু হয়ে ওঠে। প্রথমে হোটেল মালিককে আলাপী বারণ করেছিল কয়েকবার কিন্তু মালিক শোনেনি। এরপর আলাপী বাধা দেয়নি সামাজিক কারণে, আশ্রয় পাবার প্রয়োজন অনুভব করে।
মহাপুরুষ ! কে মহাপুরুষ? আলাপীর স্বামী; হোটেল মালিক সরকার বাড়ীর চেলেরা নাকি চেয়ারম্যান মহাপুরুষ? না, হোটেলে যারা খায় তারা মহাপুরুষ, আলাপী জানে না কে মহাপুরুষ, তবে জানতে চায় মহাপুরুষ কি?
নারী একজন একা পথে; তার এক বুকে ওড়না নেই। দুটি স্তনের একটি তার ঠিকরে বের হয়েছে; মেয়েটি চলছে তো চলছেই; কোন দিকেই খেয়াল নেই তার। মনে হচ্ছে, মেয়েটি রহস্য উপন্যাসের কোন চরিত্র; কখনও মনে হচ্ছে মেয়েটি ছিনার, আবার কখনও মনে হয় মেয়েটি উন্মাদ, কখনও বা মনে হয় সে ডাইনী। আসলে সে কে?
সে যেই হোক না কেন; তার দিকে চেয়ে থাকবে কুনজরে সাবপুরুষ। এমন কি কেউ আছেন, তার দিকে ফিরে চাইবেন না; একবারও?
আলাপী কাজ করে হোটেলে; প্রতিদিন সঙ্গ দিতে হয় বিভিন্নভাবে শত শত মানুষকে। আলাপী ইচ্ছে করে এপেশায় আসেনি বাধ্য হয়েই আসতে হয়েছে তাকে। আলাপীর দিকে সবাই তাকায় কিন্তু, আলাপী সবার দিকে চাইতে পারে না। কেউ কেউ আলাপীর দিকে তাকাত মায়ের দৃষ্টিতে, কেউ তাকাত বোনের দৃষ্টিতে, কেউবা তাকাত লিপ্সু ভাবে। আলাপী সকল দিকে চাইত খুব সাধারণ ভাবে। আবার, কখনও অনেকে হোটেলে আসত; যারা আলাপীকে দেখেও দেখত না; যারা আলাপীর দিকে কখনও তাকাত না, তাদেরকেই আলাপীর মনে হত মহা পুরুষ।
যে নর্দমায় গন্ধ বিকট; যার পাশ দিয়ে যাবার সময় রুমাল দিয়ে নাক ঢাকতে হয় সর্বক্ষণ। তার পাশে যদি কোন পুরুষ এক ঘন্টা ধ্যান করতে পারে; তবে বোঝা যাবে ঐ মানুষ অন্যর জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারবে। ঐ মানুষকেই দরকার আমাদের সমাজে আমাদের সংসারে। ঐ মানুষের ভেতরে এমন কিছু আছে যা সাধারণ মানুষের ভেতরে নাই। সে এক অসাধারণ, কল্পিত, অদ্ভূত পুরুষ । সেই মহাপুরুষ, তাকেই মহাপুরুষ বলা যেতে পারে।
রজব বৌয়ের দুঃখ বোঝে; বৌ তার গোটা সংসার একা চালাচ্ছে। আলুথালু বেশে দিন-রাত্রি পরিশ্রম করে; তার দিকে চাইবার মত তার সাথে ভালভাবে কথা বলার তাকে ভালভাসার মানুষ নেই, আছে শুধু দুঃখ দেবার মানুষ। রজবের গণ্ড বেয়ে দু ফোঁটা অশ্র“ পড়ে।
পুরুষ আবার কাঁদে; অসহায় পুরুষরা কাঁদে। কান্না শিশুও নারীদের একচেটিয়া সম্পত্তি কি? বৌ তার সাতসকালে ঘর থেকে বেরী হয়; সারা দিন ঘর্মাক্ত হয়ে কাজ করে। শত পুরুষের চোখের সামনে থাকে বউ; কখন কি হয়? সমস্ত চিন্তায় আসক্তি আসে রজবের; রজব অবসেশনে ভোগে। রজব বিষন্ন ক্লান্ত চোখে চেয়ে থাকে মাথার উপরের আকাশ পানে। রজব কাঁদতে চায় একটু হাল্কা হতে চায়; কিন্তু কান্নাও রজবকে দুরে ঠেলে দেয়; রজব কাঁদতে পারে না। কিছু একটা করা উচিৎ রজবের, কোন উপার্জনের পথ। অবশেষে রজব ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে পড়ে। গঞ্জের বড় বাজারে, আবার কখনও বাইপাস মোড়ে রজব ভিক্ষা করত।
এর পর প্রায় রোজ রাতেই হোটেলের মালিক আলাপীকে রাড়ী পৌছে দিত। মাঝে মাঝে আলাপী ট্যাকে স্পর্শ অনুভব করত, আলাপী খুঁজে বেড়াত স্বর্গ; কখন যে স্বর্গ থেকে বেরিয়ে আসত আলাপী নিজেই টের পেত না। হোটেল থেকে বাড়ী ফেরার পথে আলাপী হোটেল মালিকের সাথে অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে কথার উদ্রেক ঘটাত। মালিকের সাথে আলাপীর কথা বলতে খুব ভাল লাগত। হোটেল মালিক ও কি কম যায়? সে কাছে আসতে চায় আলাপীর; আলাপীর আহ্বান পুরঙ্গণাদের মত নয়; একদম অকৃত্রিম আহ্বান। কাছে আসতে আসতে তারা এত কাছে আসে; পৃথিবীর এমন শক্তি নেই যে তাদের আলাদা করে।
তারা আরও কাছে আসতে চায়। মালিক আলাপীকে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল, আলাপী কি রাজী হবে?
আলাপী সংসার ভাঙতে পারবে না; বাচ্চাদের কষ্ট েিদত পারবে না; পারবে না স্বামী-সন্তানদের অর্ধাহারে রাখতে। কিন্তু মালিক নারাজ; আলাপীকে মালিক চায় তিন নম্বর বউ হিসাবে। আলাপী ইচ্ছা করলে মালিকের তিন নম্বর বউ হতে পারে। মালিকের বাড়ী গিয়ে পায়ে পা তুলে থাকতে পারে; নতুন শাড়ী পড়ে বেড়াতে পারে। আলাপীকে মালিক মাঝে মাঝে বখশিস দিত ওতেই সে খুশি ছিল।
রজব রতিক্রিয়ায় ছিল চোয়ার। আলাপীর অসহ্য লাগত মাঝে মাঝে, কিন্তু পর সুখের দোলায় নেড়িকুত্তা হয়ে যেত সে। অসুস্থ হবার পর রজবের গতি ঠিক আছে, কিন্তু তাতে শুধু রজবই সুখী; আলাপী নয়। নিছক অর্থের জন্য নয়; নিছক মোহে পড়ে নয়। নিছক প্রেপ্সুতার বশীভূত হয়ে নয় আবার নুলো থাবার শিকার হয়েও নয়; আলাপী হোটেল মালিকের সান্নিধ্যে যেত কিছু অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেবার জন্য।
‘আমার মন মানে না দিন রজনী; আমার মন মানে না।’ রবি ঠাকুর যথার্থই বললেন। মালিকের স্পর্শকাতরতা দিন দিনই বাড়ল; সেভুলে গেল স্থান কাল পাত্র। নারী লজ্জার প্রতীক কিন্তু আলাপী নিরূপায়। এই বিষয়গুলি এমনই হয়; আলাপী ভুলে গেল দেশচার, দূরবেক্ষিত করল সমস্ত; হয়ে উঠল দুরবগম্য। নারীত্বের কাছে বিসর্জন দিল, বধূসত্ত্বা ও জননীসত্ত্বা অর্থের কাছে হার মানল তার সততা; এই বিষয় গুলি এমনই হয়। বিষয় গুলি পৃথিবীতে যে বিরল তা নয়; খুব সাধারণ খুব স্বাভাবিক বিষয়গুলি। বুর্জোয়া শ্রেণীতে মানুষের আভ্যন্তরীণ রদবদলের চিত্র সর্বদা প্রস্ফুটিত।
এরপর খুবসম্ভবত: আরো একটি সাধারণ-স্বাভাবিক চিত্র ফুটে উঠেছিল সবার সামনে। আলাপী ও হোটেল মালিকের বিষয়টি গেল আরো বেশ কিছু দিন। অনেকে দেখেও না দেখার ভান করল; অনেকের লোলুপ দৃষ্টি পড়ল সবার মতই। অনেকে প্রতিবাদ করতে চাইল। এ ভাবে চলল কিছুদিন; অতপর: কিছু উৎসাহী লোকের কল্যাণে হোটেল ঘেরাও দেয়া হলে যথারীতি আলাপী এবং হোটেল মালিককে নতুন ভাবে আবিষ্কার করা হয়; যেমনটি চেয়েছিলেন দর্শনাথীরা। এরপর রীতিকে অতিক্রম না করে আয়োজন করা হয়েছিল গ্রাম্য শালিসের। গ্রাম্য শালিসে, আলাপীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং বৌ নিয়ন্ত্রণ না করার জন্য রজকে গালমন্দ করা হয়। রজবের বৌকে বিশ ঘা বেত্রাঘাত করা সহ রজবের পুরো পরিবারকে ‘এক ঘরে’ করা হয়। হোটেল মালিককে অর্থদন্ড দেওয়া হয়; ঐ অর্থ জমা হবে গ্রামের কল্যাণ তথা গ্রাম্য প্রধানদের কল্যাণে। আলাপীর বিরুদ্ধে সেদিন অনেকে অনেক অভিযোগ তুলেছিল; কেন সে বেপর্দা হয়ে চলাচল করে, কেন সে মেয়ে মানুষ হয়ে হোটেলে কাজ করে, কেন সে সরকার বাড়ীর ছেলেদের মাথা খেয়ে ছিল ইত্যাদি, ইত্যাদি।
বিদ্যার দৌ[ড় নেই আলাপীর, জীবনে কখনও চৌপাটির দেহুরী মাড়ায়নি সে। কিভাল, কিমন্দ সে জানেনা। গ্রামের আরও দশ জন মেয়ে যা করে, যা করতে পারে, আলাপীও তাই করে। আলাপী কোথায় ভুল করেছিল তা বুঝতে পারে না; কি তার করতে হত তাও বুঝে উঠতে পারেনি। সে আনমনা হয়ে যায়, এলোমেলো চুলে-শাড়ীতে গাছের শাখা প্রশাখার চির দিয়ে চেয়ে রয় আকাশ পানে এক দৃষ্টিতে, অবশ্য মাটির দেয়ালে হেরান দিয়ে। এ এক গভীর দেহাত্মপ্রত্যয় যেন ! পৃথিবীর এমন কোন দুর্বোধ্য শক্তি নাই যা এ প্রত্যায়কে নস্যাৎ করে। এ এক আমোঘ বিশ্বাসের রূপান্তর।
রাতে ঘুম ভেঙেছিল রজবের, পাশে তার বউ নেই। বউ হয়ত প্রয়োজনে মেহন কর্ম সাড়তে গেছে, আশ্চর্য়ের বিষয় কিছু নয়। দীর্ঘক্ষণ সুনসান-নিষ্পাপ নিরবতা; এই সময়ের ভেতরে পশুপাখি ছাড়া কেউ নীরবতা ভাঙতে পারেনি। বাইরে কুকুরের ডাক শুনতে পেল রজব। রজবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল, গেল কোথায় বউ? বউ ফিরল স্বাভাবিকভাবে রজব ঘুমের ভান করে। পরপর কয়েক রাত একইভাবে কাটল রজবের। রজব প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
কৌতুহলী হয়ে এক রাতে রজব যায় বৌয়ের পথ ধরে। বেশ কিছু সময় পরে রজব পায় আলাপীকে; কিন্তু অন্যভাবে। অন্যভাবে আবিষ্কার করে হোটেল মালিককে রজব আলাপীর সাথে; সম্ভবত: মৈথুন ক্রিয়ায়রত। কৈ গিছিলি আইজক্যা? প্রশ্ন করে রজব; আলাপী প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেবার কথা বলে। তুই যেই কামের কতা কইলি সেই কামে এত সময় লাগেনি? এককামের কতা কইয়া অন্য কাম করস তুই পুরুষ গো লগে ঢলাঢলি করতেযাছিস। উত্তেজিত কন্ঠে বলে রজব আলাপীও খেপে যায়। “এই দশদিন পোল-পাইনগোর মুখে কেমনে ভাত তুইল্যা দিছি খোঁজ রাখছেন? আপনের সংসার কেমুনে চলে জানেননি? আপনে খাবার পাইলেন কই থেইকা আমনে না পুরুষ মানুষ? আমনে উপায় করতে পারেন না, এত বড় বড় কথা আহে কই থেইকা? লুলা মানুষের এত দেমাগ বালানা। রজব সত্যই ক্ষেপে যায় এবং আলাপীকে মারতে উদ্যত হয় কিন্তু পারেনা; পড়ে যায়। মনে পড়ে রজবের সে লুলা; সে অপারগ। আলাপী ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকার অমানিশায় মিশে যায়। রজব আলাপীকে গালি দিয়েছিল অশ্রাব্য ভাষায়, বেশ মানসিক কষ্ট তার, রজব জ্ঞান হারায়। পুরুষ মানুষের দুটি বিষয় স্পর্শ-কাতর; প্রথমত; তার পুরুষত্ব নিয়ে কথা বললে; দ্বিতীয়ত: তার অর্থ উপার্জন নিয়ে কথা বললেথথথথথথথথ এই দুটি বিষয় পুরষের অলংকার। এই দুটি বিষয়ে আলাপী খোঁচা দিয়েছে; রজব সহ্য করতে পারেনি, পারার কথাও নয়। রজব বড় বেশি ভালবাসে আলাপীকে; আলাপীও ভালবাসে রজবকে; রজবের সংসারকে।
এরপর প্রায় রাতেই আলাপী বাইরে থাকত। কখনও সন্ধ্যায়, কখনও রাত ভারী হলে আবার কখনও মাঝ রাতে; কখন যে ফিরত কোন সময় সীমা ছিল না। কখনও আবার বের হলে ফিরতে সকাল হয়ে যেত। এই আলাপীর নব জীবন। আলাপীদের একঘরে করা হয়েছিল; এটা তার মনে থাকতনা। সমাজের গুটি কয়েক মানুষের সাথে তার ওঠাবসা, যারা সেই সমাজের নিয়ন্ত্রক। এক ভ্রুকুটিতে চলে আলাপী; শত শত মানুষ আলাপীর দিকে চাইলে ও আলাপী কিছু মনে করে না। কেউ মুখ টিপে হাসতে পারে, কেউ কিছু বলতে পারে আবার কেউবা অঙ্গভঙ্গি বা ইশারা করতে পারে এতে কিছু এসে যায় না আলাপীর। আলাপী অবিচল, নিশ্চল, দেহাতœবাদে ভরপুর ছায়ামূর্তি যেন এক। আলাপী দুদান্ত দাপটে চষে বেড়াত গঞ্জের বাজার; রাতে-বিরাতে ঘুরত ফিরত। কোন মোড়ল, কোন গ্রাম প্রধান, মৌলবী, অথবা কোন মুরুব্বি তার পথের বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনা। তার কাছে মূল্য নেই মোড়ল-মৌলবীর রক্ত বর্ণের চক্ষুর। সে মানেনা ধর্মীয় অনুশাসন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক বন্ধন অথবা, রাষ্ট্রীয় নিয়ম; আলাপী জানতে চায়না এসব। সে শুধু জানে কিভাবে অর্থ আয় করতে হয়; কিভাবে স্বামী সন্তানদের মুখে দুবেলা দুমুঠো আহার তুলে দিতে হয়।
আলাপীর দুইছেলে দুইমেয়ে, বড় ছেলে কাজ করত এখনও করে, এর পরের মেয়েটি বাড়ীতেই থাকত তবে এখন অন্যর বাড়ীতে কাজ করে এবং থাকে। পরেরটি ছেলেটি চার বছর বয়স এবং সর্বশেষ আলাপী কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে। আলাপীর সন্তানরা কেউ অভাবের তাড়নায় চৌপাটি নিম্নস্তর সামপ্ত করতে পারেনি। আলাপীর সন্তানরা গণ্ডমুর্খ হয়ে বড় হবে। আলাপী যে মেয়েটিকে অন্যর বাড়ীতে কাজে পাঠিয়েছে, জানেনা যৌবনাবতী হবার পর তার মত অবস্থা হবে কিনা। আলাপী জানেনা সর্বশেষ কন্যা সন্তানটির পিতা কে। আলাপীর স্বামী নিশ্চিত করে বলতে পারবে না সন্তানটি তার ঔরসে জন্মেছে কিনা। আলাপীর স্বামী সব জানে, জেনেও না জানার ভান করে। আলাপী উপার্জন করে, তার স্বামী ভিক্ষুক, বড় সন্তান কিছু উপার্জন করে। সচ্ছল দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে আজ বড় আলাপীর; সন্তান স্কুলে যায়, স্বামী ভ্যান নিয়ে বেড়োলো। আলাপীর মানসপটে ভেসে ওঠে সেই চিত্র; ভবিষৎ ডাকছে আলাপীকে তার বিকশিত সৌন্দর্য আলাপীর শরীরে মেখে দেবার জন্য।
শুধু হোটেল মালিকই নয়, অনেক খদ্দের আলাপীর কাছে আসে। কখনও তাদের বাড়ীযেতে হয়, কখনও কোন গোপন ঘরে, আবার কখনও--------কখনও দিনে, কখনও রাতে অথবা যখন তখন ডাকপড়ে আলাপীর। কোন আসরে সবাই বাংলা মদ গিলছে, চলছে বাংলা বা হিন্দী সিনেমার বাণিজ্যিক গান; এমন অবস্থায় নাচছে আলাপী; আলাপী নাচতে জানেনা, শুধু নাচের নামে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে সবাইকে মজা দেবার জন্য। কখনও একজন কখনও একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি হয় আলাপীর। কখনও ডে-শিফট, কখনও নাইট শিফটথথথথথথথথথঅর্থের জন্য মানুষ সব পারে, সব। পৃথিবীর সবচেয়ে গর্হিত, পঙ্কিল কাজটি করে আলাপী। নিজের এক শরীরের সাথে শত পুরুষের শরীর নিয়ে খেলা। সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় কোন স্বীকৃতি নেই এতে; ইহলৌকিক-পারত্রিক কোন কল্যাণও নিহিত নেই এতে; তারপরও দুপক্ষই পিছপা হতে নারাজ। আলাপী জানে এটি মহৎ কাজ; শত পুরুষের মনোরঞ্জনকারী সে। মানুষকে খুশি রাখতে পারে, আনন্দ দিতে পারে ক’জনা? মহাবিশ্বের নিরঙ্কুষ সতা; পুরুষ দুর্বল তার জৈবিক চাহিদার কাছে, আর এই চাহিদা পূরণ করে পূরনারী। পৃর্থিবীতে জৈবিক চাহিদা না থাকলে কুলটা শ্রেণীর উদ্ভব ঘটনা; সকলে জৈবিক চাহিদাকে যদি নিয়ন্ত্রণ করত তবে, বিকাশ হতনা বৈতালিক শিল্পের। কিছু নোংরা মানুষ, কিছু সমাজের নর্দমার কীট, যারা ছাইপাঁশ খায় এবং ছাইপাঁশের ভেতরে বসবাস করে; তারা যদি আজ প্রতিজ্ঞা করে কোন কুলটার সংস্পর্শে যাবেনা; তবে আজই বৈতালিক শিল্পের বিকাশ স্তব্ধ হবে। তাই, বৈতাল অথবা ছাইঁেপশে মানুষ কাউকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবেনা।
মালিক সম্ভ্রান্ত মানুষ, চাকরানীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের পর জন্ম হয় এক সন্তানেরথথথথথথথথ এই সেই ভ্যান চালক রজব। রজবের জন্মের পর রজবকে দেখে খুশি হয়ে, মালিক একটি ভিটায় রজব ও তার মায়ের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এই বাড়ীতেই রজবও আলাপীর বাস। আলাপীর মা ছিল কোন এক ধনাঢ্য মানুষের রক্ষিতা; শেষ বয়সে মাও মেয়েকে বের করে দেওয়া হয়; যখন আলাপীর মায়ের সৌন্দর্য নষ্টের পথে ছিল। এরপর পথে পথে ঘুরত আলাপীর মা ও আলাপী জীবন নৌকা যখন জোয়ার-ভাটায় বিক্ষত, ঠিক তখন নৌকোটি রজবের ঘাটে ভিড়েছিল। আলাপী রজবকে বোঝে, রজবও আলাপীকে; তারা দুজন দুজনার, শুধুই দুজনার। আলাপী-রজবের সামাজিক স্বীকৃতি না থাকলেও, তাদের সন্তানদের সামাজিক স্বীকৃতি তারা দিতে পেরেছেথথথথথথএকথা ভেবে তারা দুজনা খুশি।
আলাপীর যে মেয়েটা মানুষের বাড়ী কাজ করে, তাকে আলাপী এক দিনের জন্য বাড়ী নিয়ে এসেছে, নিজের কাছে রাখবে বলে। একটা ছোট মেয়ে কত কাজ করে মানুষের বাড়ীতে; আলাপী তার দিকে তাকায় আর নিজের কথা ভাবে। এই মেয়েটির চেহারা অনেকটা আলাপীর চেহারার সাথে মিলে যায়। মেয়েটি তার শ্যামবর্ণ; চাহনিতে প্রশ্ন; এই বয়সে তার বাবা-মার স্নেহ সান্নিধ্যে থাকার কথা।
দন্তে অপরিষ্কারের প্রচ্ছন্ন ছাপ, কায়াতে ধূলাবাশি অঢেল, চুল এলোমেলো যেন বিক্ষুদ্ধ পরিচ্ছদ আটপৌড়ে হলে ও মলিন; চেহারাতে স্পস্ট পরিশ্রমের চিন্থ; মোট কথা এযেন বাংলাদেশের পরিশ্রান্ত কিশোর শ্রমিকদের প্রতিনিধি। এতদ্সত্ত্বেও, মেয়েটির অক্ষিগোলক গভীর, দৃঢ় দৃষ্টি; অক্ষিগোলক ঠিকরে বের হয়ে আসছে কিছু প্রশ্ন; আলাপী জানে না কি সেই প্রশ্ন কি তার উত্তর। মেয়েটির চোখে মনে আগুনের যে উত্তাপ তা হঠাৎ যেন বের হয়ে আসছে ঐ আগুন পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে গোটা বিশ্বের সমস্ত পঙ্কিলতাকে। এত কিছু ছাপিয়ে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে আলাপী লাবণ্য খুঁজে পায়। আলাপী ভাবে, তার মাও তার দিকে এমনিভাবে দেখত। তারমত সৌভাগ্য তার মেয়ের হবে কি?
প্রভাতবেলা; আলাপী মাজারে যাচ্ছে পীরবাবার দোয়া চাইতে। পথে দুটোকাককে দেখল মরা মুরগি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। আলাপী মরা মুরগিকে নিজের প্রতীক বলে ধরে; অন্যদিকে দৃষ্টি দেয়, ফুলফুরে সুন্দর বাতাস। পথ-ঘাট-মাঠে জনমানব কম, শুধু কৃষকের সাঠে যাবার দৃশ্য, দৃশ্যমান। শীত আসন্ন, কুয়াশা পড়েছে মাঠে; পথ চলার সময় কুয়াশার কাদা লাগছে আলাপীর পায়। আর কিছু দিনপর সরষের হলুদ ফুলে ছেয়ে যাবে গোটা মাঠ ভাবতেই খুশিতে ভরে ওঠে আলাপীর মন। আর সরষে ফুলে বসবে হরেক রকম জীব; শোষণ করবে মধু; আর সরষে পড়ে থাকবে তার নিজ স্থানে। লম্বা অবগুন্ঠনে ঢাকা আলাপীর মুখ; পায়ের পাতা; হাত আর মুখমণ্ডলের একাংশ ছাড়া সমস্ত শরীর ঢাকা তার শাড়ীতে। প্রাতঃ কালীন স্নান সেড়ে পূতঃপবিত্র হয়ে মাজারে রওনা দিয়েছে সে। আলাপী মাজারে গিয়ে নিজের কৃতকর্মের ক্ষমা চায়, স্রষ্ঠা সব জানেন। প্রার্থনা করে সন্তান-স্বামী-সংসার যেন থাকে সমস্যাবিহীন।
আলাপী মাজার থেকে বেড়িয়ে আসে। মাজারে অনেকে অনেক কিছু দিয়েছে; সিন্নি-অর্থ-মুরগী ইত্যাদি। আলাপীর সর্বোচ্চ সম্বল পাঁচ টাকা, আলাপী দেয় খাদেমের হাতে। খাদেম একবার টাকার দিকে চায় আবার আলাপীর দিকে। বিরক্তির ভাব দেখিয়ে টাকা পাঁচটি হাতে েেনয় খাদেম। এরপর আলাপী তাকে বিড়ি হাতে মাজার থেকে বের হতে দ্যাখে। সারা রাত উরস চলেছে এখানে অনেক লোকের সমাগম হয়েছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে যার পথে চলছে। ঘর কাতর মানুষের সাথে আলাপীও যোগ হয়। সামনে কাক পেছনে ছায়া পুরুষ, মাঝে আলাপী চলছে তার নিজ গন্তব্য জুড়ে। এভাবে পথ চলতে চলতে আলাপী পেয়ে যাবে গন্তব্য; পেয়ে যাবে বাড়ী। এরপর দুপুর গড়িয়ে আসবে বিকেল; বিকেলের পর নামবে সন্ধ্যা। সন্ধ্যা সমাপ্ত হলে গাঢ় রাত্রথথথথথথথএভাবেই চলতে থাকবে। কিন্তু, দিন বদলাবে না আলাপীর; হয়ত কোন নতুনত্ব যোগ হবে না তার জীবনে।
এ মাস পরেই ছাড়তে হবে আলাপীদের ভিটে।
এরপর শুধু শূন্যতা.........................................................................................। স্টেশনে সন্ধ্যার ট্রেন থামে এবং যথাবিহীত চলেও যায়। আলাপী বাড়ী থেকে বের হয় জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে। একটু পর শুরু হবে আলাপীর নাইট শিফট ওয়ার্ক। এই মুহুর্তে আর কিছু ভাবতে চাইছে না আলাপী।
পট পরিবর্তিত হল;