রবিবার, ১০ জুলাই, ২০১১

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দুই বছর

শরিফুল ইসলাম সেলিম


একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আকাঙ্ক্ষা বহুদিন ধরে লালন করে আসছে এ দেশের মানুষ। যার ফলশ্রুতিতে এবং কিছুটা আন্তর্জাতিক চাপে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর জারি করা হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৭। এরপর ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং মুনিরা খান ও অধ্যাপক নীরু কুমার চাকমাকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়। এর কিছুদিন পরই ক্ষমতায় আসে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নতুন সরকার কীভাবে গ্রহণ করে, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে অনুমোদন না দেয়ায় কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। অবশেষে ৭ জুলাই ২০০৯ সংসদে উত্থাপিত হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯। ৯ জুলাই ২০০৯ তা সংসদে পাস হয় এবং ১৪ জুলাই ২০০৯ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। নতুন আইনটিকে ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাজকর্মকে বৈধতা দেয়া হয়। ২০০৭ সালের অধ্যাদেশ অনুমোদন না করে সরকারের নতুনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ প্রণয়নের কারণ খানিকটা অনুমান করা যায়। বর্তমান সরকার হয়তো চায়নি ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রতিষ্ঠিত হোক যে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয়েছে একটি অনির্বাচিত সরকারের হাতে।
গত দুই বছরে কমিশনের তেমন কোনো কাজ দৃশ্যমান হয়নি। কিছু কিছু ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ, কোনো ভিকটিমকে দেখতে যাওয়া অথবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়ার মধ্যেই মূলত তাদের কাজ সীমাবদ্ধ ছিল। তবে কমিশন রাষ্ট্রপতির কাছে যে প্রতিবেদন দাখিল করে এবং তারা নিজেদের পরিচিতিমূলক যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছে, তা থেকে কমিশনের কিছু কাজের কথা জানা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে যখন খবর প্রকাশিত হয় যে আটক আদিবাসী নেতা রাংলাই ম্রোকে ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তখন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ তাকে দেখতে যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হওয়া অগ্নিদগ্ধ মিনার সাথে, গরম তেলে পুড়ে যাওয়া শিশু মাসুমের সাথে কমিশনের সদস্যরা দেখা করেন। তাছাড়া বেশ কয়েকটি ক্রসফায়ারে মৃত্যু ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক ‘অপহরণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিশন সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছ থেকে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি পাঠায়। কয়েকটি ক্ষেত্রে কমিশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়, যেমন: বাপ্পীর মৃত্যু (এক বাপ্পীর পরিবর্তে অন্য বাপ্পীর ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা), মহিউদ্দিন আরিফ নামের একজনের মৃত্যু, থানা হেফাজতে আসামির মৃত্যু, ১০ মাস ধরে র্যাব সদস্যের নিখোঁজ থাকা, ৩৮ দিনেও এক ব্যবসায়ীর খোঁজ না পাওয়ার ঘটনা, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশিদের হত্যা, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর নিপীড়ন, অব্যাহত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ইত্যাদি। এছাড়াও র্্য্যাবের গুলিতে আহত ঝালকাঠির লিমনকে পঙ্গু হাসপাতালে দেখতে যান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশিহ্মষ্ট ব্যক্তিদের ঘটনা তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কিন্তু তিনি নিজে তদন্তের উদ্যোগ নেন নি। এভাবেই হেফাজতে মৃত্যু, লাশ গুম, ক্রসফায়ারসহ নানা ঘটনায় আইনশৃ´খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সেসব ইস্যুতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এখন পর্যন্ত নজির স্থাপনের মতো কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। কমিশনের চেয়ারম্যান অবশ্য প্রতিদিনই নানা সভা-সেমিনারে মানবাধিকার বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ।কমিশনের গত দুই বছরের কার্যক্রমের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত হলেও তা নিজস্ব ছিল না। বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠনের মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে কাজ করেছে কমিশন। বিধি চূড়ান্ত না হলে কোনো অভিযোগের তদন্ত সম্ভব নয়। বিধির পাশাপাশি লোকবল, যানবাহনসহ নিজস্ব অফিসও জরুরি। কমিশনের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ অনুসারে বিচারাধীন কোনো বিষয় নিয়ে তদন্ত করতে পারবে না কমিশন। আবার বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত শেষে শুধু সরকারকে পরামর্শ দেওয়া ছাড়া কমিশন নিজে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে না। আইন অনুযায়ী কমিশন সরকার বা এর কর্তৃপক্ষের কাছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রতিবেদন চাইতে পারবে। তবে না পেলে করণীয় স্পষ্ট নয়। এ ধরনের শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে কমিশন চালানো যাবে না এটি ধ্রুবতারার মতো স্পষ্ট। তাই যদি মানবাধিকার কমিশন রাখতে হয় তবে এটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। অন্যথায় এ প্রতিষ্ঠান পুষে সরকারের কোনো উপকার হলেও হতে পারে, তবে জনগণের কোনো কাজে লাগবে না।
তারপরেও সরকার কমিশনকে অনেক কিছু না দিলেও যেটুকু ক্ষমতা দিয়েছে, এর ন্যূনতম ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সীমাবদ্ধতার মাঝেও কমিশন চাইলে অনেক কিছু করতে পারে। কারণ যেকোনো ঘটনা তদন্তে কমিশন চাইলেই লোকবলসহ প্রশাসনিক সহায়তা পেতে পারে। অন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোও কমিশনকে নানাভাবে সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু কাজের উদ্যোগ না থাকলে তো কেউ কিছু করতে পারবে না।মানবাধিকার কমিশনকে সহায়তা করা মানেই হচ্ছে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা। সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এ ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান এখন কার্যত কোনো কাজই করতে পারছে না। গত দুই বছরে কমিশন মানবাধিকার ইস্যুতে একটিমাত্র ঘটনার তদন্তে অংশ নিলেও সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি আজো। কাগজে-কলমে কমিশনের অস্তিত্ব থাকলেও এখন পর্যন্ত বিবৃতি ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া ছাড়া কার্যত কিছুই করতে পারেনি তারা। তদন্তের বাইরে রয়ে গেছে বহু অভিযোগসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শতাধিক ঘটনা। মানবাধিকার কমিশনে বর্তমানে আইন আছে, বিধি নেই। অভিযোগ আছে, তদন্ত নেই। পদবি আছে, লোকবল নেই। কমিশনের নিজস্ব কোনো অফিসও নেই। ফলে মানবাধিকার ইস্যুতে কমিশনের দৃষ্টান্তমূলক কোনো কাজ নেই। প্রশ্ন উঠেছে, এমন কমিশন থাকা না-থাকা যখন একই তাহলে এই কাগুজে বাঘ পুষে লাভ কী! কিন্তু এটি তো হলো নেতিবাচক চিন্তাপ্রসূত কথা। একে কী করে ইতিবাচক করা যায় সেটি নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের।

(শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন